Newspaper & Media

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বললেন, ‘বাজারে এমন অস্ত্রের সংখ্যা একটি বা দুটি নয়; বরং অনেক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সন্ত্রাসীদের হাতে অবৈধ ও নতুন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্রের উপস্থিতি এবং এর ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফল।’ তার মতে, দ্রুত এসব অস্ত্রের অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং উৎস বন্ধ করা না গেলে তা জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। শুধু বিচ্ছিন্ন বা লোকদেখানো অভিযান নয়, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সমন্বিত ও কার্যকর অভিযান প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া সম্ভব নয়। গ্রেপ্তার মূলত একটি সাময়িক বা ‘কিউরেটিভ মেজার’ ব্যবস্থা। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন ‘প্রিভেন্টিভ মেজার’ বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ মাদকের মূল উৎস, সীমান্তবর্তী চ্যানেল ও পুরো সাপ্লাই চেইন বন্ধ করা। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। কারণ মাদকের পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। এই স্বার্থের বলয় ভাঙতে সরকার কতটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত, সেটিই মূল বিষয়। তিনি বলেছেন, মাদকের মূল সোর্স বা উৎসের জায়গায় হাত না দিয়ে শুধু শহরকেন্দ্রিক গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো হলে তা অনেকটা জনতুষ্টির চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়। এতে অপরাধ দমনের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না। তার ভাষায়, মাদকের পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ বা ‘পলিটিক্যাল ইকোনমি’ কাজ করে। এই অর্থনৈতিক বলয় ও সরবরাহ ব্যবস্থা ভাঙতে হলে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সরকারের সদিচ্ছা প্রয়োজন। একই সঙ্গে পুলিশের রাজনৈতিক নির্ভরতা, পেশাদারিত্বের ঘাটতি ও অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতি দূর করার দায়িত্বও সরকারের। তাই মাদক নিয়ন্ত্রণে গ্রেপ্তারের পরিসংখ্যান নয়; সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছায় মাদকের উৎস ও সাপ্লাই চেইন কতটা বন্ধ করা যাচ্ছে, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি। তিনি আরও বললেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে অনেকে ছোট অপরাধী। যারা বেশি দিন কারাগারে থাকেন না, জামিনে বেরিয়ে যান। ফলে অপরাধীদের একটি চক্র তৈরি হয়, যেখানে একই অপরাধী বারবার গ্রেপ্তার হলেও অপরাধপ্রবণতা কমে না।

Dhaka University Department of Peace and Conflict Studies chairman Sazzad Siddiqui said that people were now facing a security dilemma. ‘It was unfortunate that the ousted Awami League government created a political narrative by capitalising on the ‘extremist’ issue,’ he said.

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তরুণদের আত্মত্যাগ বারবার এক ধরনের চক্রাকার হতাশার জন্ম দিয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন তরুণ সমাজ এক পর্যায়ে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছিল। তরুণদের ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তথা নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্রের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাও পরবর্তীতে ২০০৬ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। চব্বিশের আন্দোলনেও তরুণ শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে, জীবন উৎসর্গ করে একটি স্বনির্ভর, সার্বভৌম ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছিল। স্বপ্ন ছিল কীভাবে এই দেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।কিন্তু প্রতিবারই এই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের প্রচলিত নোংরা অপরাজনীতির সংস্কৃতি। আজও শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে একদিকে যেমন হতাশার ছায়া দেখি, ঠিক তেমনি এর বিপরীতে এই প্রত্যয় লক্ষ্য করি যে, ভবিষ্যতে যে সরকারই অগণতান্ত্রিক পথে হাঁটবে, তার পরিণতি এমনই হবে। তারা আবারও রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করবে না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বৈষম্য দূর করে যুবসমাজের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর এভাবেই গণতান্ত্রিক চর্চা সুদৃঢ় হবে এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের যে অপরিশোধ্য ঋণ রয়েছে, তা কিছুটা হলেও শোধ হবে। প্রকারান্তরে বাংলাদেশ একটি সত্যিকার অর্থে স্বনির্ভর জাতিরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। আমাদের বুঝতে হবে, চব্বিশের আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের মূল দাবি ও স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই আন্দোলনের সূত্রপাত ছিল কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে। তাই বর্তমান সরকারকে এই মনস্তত্ত্বটি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থায় সময়োপযোগী আমূল পরিবর্তন এবং স্বল্পমেয়াদে যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত ও বৈষম্যহীন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী বিপ্লব ও পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পৃথিবীর সব বিপ্লবের পরে একটি শক্তি সুপারপাওয়ার হতে চায়। তখন অনেক ক্ষেত্রে বিপ্লব ব্যর্থ হয়। আমাদের দেশেও বিপ্লব হয়েছে। তবে সেটাকে এখনই ব্যর্থ বলা যাবে না। যে দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর থাকে, বেকারত্বের হার বেশি থাকে সেসব দেশে বিপ্লব-পরবর্তী অবস্থা চ্যালেঞ্জিং হয়। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। বিপ্লবের পরে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে ছিল তারা তাদের কাজটা সঠিকভাবে করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে। তবে এরপর যে নির্বাচনটা হয়েছে তা শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এতে সংসদে দ্বিদলীয় যে অবস্থা দেখছি, তা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক মনে করি। ’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া সম্ভব নয়। গ্রেপ্তার মূলত একটি সাময়িক বা কিউরেটিভ মেজার ব্যবস্থা। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন প্রিভেন্টিভ মেজার বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ মাদকের মূল উৎস, সীমান্তবর্তী চ্যানেল ও পুরো সাপ্লাই চেইন বন্ধ করা। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। কারণ মাদকের পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।’ স্বার্থের বলয় ভাঙতে সরকার কতটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত, সেটিই মূল বিষয় বলে মনে করেন অধ্যাপক সাজ্জাদ। ‘মাদকের মূল সোর্স বা উৎসের জায়গায় হাত না দিয়ে শুধু শহরকেন্দ্রিক গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো হলে তা অনেকটা জনতুষ্টির চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়। এতে অপরাধ দমনের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না।’

সব মিলিয়ে ‘রইদ’ কেবল সহজভাবে দেখার মতো কোনো সাধারণ চলচ্চিত্র নয়। আমাদের প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সর্বোপরি ‘সভ্যতা’ নিয়ে আমাদের যে তীব্র অহংকার, তার বিপরীতে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দেওয়াই ছিল এই সিনেমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা ও শক্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলছিলেন, মাদকাসক্ত মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা বা ধর্ম-সমাজের কোনো ভয় থাকে না। তারা এমন একটি মানসিক অবস্থায় চলে যায় যে, নানা অপরাধসহ জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না। মাদকের রুট বা উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং যারা মাদকাসক্ত হয়ে গেছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে সমাজে ছিনতাই-রাহাজানিসহ নানা অপরাধ কমে আসবে। তার কথা, ‘এখানে মূল সমস্যা হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা প্রিভেন্টিভ মেজারের অভাব। মাদকের অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী। যেমন বিদ্যুৎ খাতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট থাকে, তেমনি মাদকের ক্ষেত্রেও দেশি-বিদেশি এবং স্থানীয় চক্রের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এই চক্রের প্রভাব এতটাই যে, তা নীতিনির্ধারকদের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যখন এই মূল উৎসে হাত দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা আড়ালে থেকে যায়।’

সব দিক বিবেচনায় ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তির জন্য মঙ্গলজনক। এই যুদ্ধ শুরুর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল, আগামী দিনে তার পুনরাবৃত্তি না করাই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। এ ধরনের জটিল আঞ্চলিক সমীকরণে কোনো এক পক্ষকে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়ার চেয়ে নীতিগত ভারসাম্য ও কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার আসল বহিঃপ্রকাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে পদ দখল এবং অর্থের সংস্থান যেখান থেকে হয়, সেই জায়গাগুলায় তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরের অপরাধগুলো দলীয় ব্যানারে ঘটিয়ে প্রতিশোধ নিতে চায়। সবমিলিয়ে আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে। বিচারহীনতা অপরাধের প্রবণতাকে বাড়িয়ে দেয় উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশ্লেষক বললেন, ‘যখন দেখা যায় অপরাধীকে বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না, তখন অপরাধপ্রবণতা জোরালোভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্যান্য সম্ভাব্য অপরাধীদের উৎসাহিত করে। সেই জায়গা থেকে দেশের স্বার্থে ও জনগণের স্বার্থে সরকারের এসব সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করা উচিত।’ দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দলীয় পরিচয় না দেখে নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি বলে মত অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেনের। তিনি বললেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো— স্থিতিশীলতা যদি না থাকে, সেখানে লোকাল বা ফরেন ইনভেস্টমেন্ট (স্থানীয় বা বিদেশি বিনিয়োগ) আসবে না।’