Newspaper & Media

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, তরুণদের আত্মত্যাগ বারবার এক ধরনের চক্রাকার হতাশার জন্ম দিয়েছে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তৎকালীন তরুণ সমাজ এক পর্যায়ে গভীর হতাশায় নিমজ্জিত হয়েছিল। তরুণদের ১৯৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তথা নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্রের যে নতুন যাত্রা শুরু হয়েছিল, তাও পরবর্তীতে ২০০৬ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। চব্বিশের আন্দোলনেও তরুণ শিক্ষার্থীরা রক্ত দিয়ে, জীবন উৎসর্গ করে একটি স্বনির্ভর, সার্বভৌম ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছিল। স্বপ্ন ছিল কীভাবে এই দেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।কিন্তু প্রতিবারই এই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় আমাদের প্রচলিত নোংরা অপরাজনীতির সংস্কৃতি। আজও শ্রেণিকক্ষের শিক্ষার্থীদের চোখে মুখে একদিকে যেমন হতাশার ছায়া দেখি, ঠিক তেমনি এর বিপরীতে এই প্রত্যয় লক্ষ্য করি যে, ভবিষ্যতে যে সরকারই অগণতান্ত্রিক পথে হাঁটবে, তার পরিণতি এমনই হবে। তারা আবারও রাজপথে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করবে না। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকারকে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা বৈষম্যের দেয়াল ভেঙে দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার এবং রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বৈষম্য দূর করে যুবসমাজের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর এভাবেই গণতান্ত্রিক চর্চা সুদৃঢ় হবে এবং তরুণ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের যে অপরিশোধ্য ঋণ রয়েছে, তা কিছুটা হলেও শোধ হবে। প্রকারান্তরে বাংলাদেশ একটি সত্যিকার অর্থে স্বনির্ভর জাতিরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। আমাদের বুঝতে হবে, চব্বিশের আন্দোলনে তরুণ প্রজন্মের মূল দাবি ও স্বপ্ন ছিল একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। এই আন্দোলনের সূত্রপাত ছিল কর্মসংস্থানকে কেন্দ্র করে। তাই বর্তমান সরকারকে এই মনস্তত্ত্বটি গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা ব্যবস্থায় সময়োপযোগী আমূল পরিবর্তন এবং স্বল্পমেয়াদে যুবসমাজের জন্য পর্যাপ্ত ও বৈষম্যহীন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করাই হবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি।

সব মিলিয়ে ‘রইদ’ কেবল সহজভাবে দেখার মতো কোনো সাধারণ চলচ্চিত্র নয়। আমাদের প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সর্বোপরি ‘সভ্যতা’ নিয়ে আমাদের যে তীব্র অহংকার, তার বিপরীতে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দেওয়াই ছিল এই সিনেমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা ও শক্তি।

সব দিক বিবেচনায় ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তির জন্য মঙ্গলজনক। এই যুদ্ধ শুরুর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল, আগামী দিনে তার পুনরাবৃত্তি না করাই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। এ ধরনের জটিল আঞ্চলিক সমীকরণে কোনো এক পক্ষকে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়ার চেয়ে নীতিগত ভারসাম্য ও কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার আসল বহিঃপ্রকাশ।

এই পরিস্থিতিতে আপাতত মনে হচ্ছে, এই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্ব অর্থনৈতিক বাজারেও চরম অস্থিরতা দেখা দেবে। এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সাময়িক লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা সফল হলেও, বস্তুত বিশ্বশান্তি ক্রমশ ক্ষীণ করে দিচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো— যুক্তরাষ্ট্রের যে একক পরাশক্তির চর্চা দীর্ঘসময় ধরে চলছিল, অনেকেই ভাবছিলেন হয়তো ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’-এর মাধ্যমে তার সমাপ্তি ঘটবে এবং বিশ্বের অন্যান্য ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক আক্রমণ থেকে মুক্তি পাবে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই সম্ভাবনাটুকুও শেষ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ, আরও এক দীর্ঘ সময়ের জন্য এই একমেরু বিশ্বব্যবস্থা জারি থাকবে বলে মনে হচ্ছে, যা বিশ্বশান্তির জন্য একটি চরম অশনিসংকেত।

এই বিরোধ নিরসনে পরিসংখ্যানের ‘কমন সেট’ তত্ত্ব একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে, যার মূল লক্ষ্য হলো বিভেদ কমিয়ে ঐকমত্যের একটি ভিত্তি তৈরি করা। বিএনপি যে ধারাগুলোতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, সেগুলোর বাইরের বাকি বিষয়গুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ জুলাই সনদের আলোকে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে নিতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা ও ছাড়ের মানসিকতা না রাখলে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, কেবল বিএনপি নয়, বরং সংসদের অন্য দলগুলোর দেওয়া দ্বিমতগুলোকেও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে পদ্ধতি হবে উক্ত বিএনপিসহ সব প্রতিনিধিত্বকারী দলের প্রস্তাবগুলোকে একেকটি আলাদা বৃত্তে প্রতিস্থাপন করলে বৃত্তগুলোর ইন্টারসেক্টেড বা সম্মিলিত সাধারণ অংশটিই হবে একটি ‘কমন সেট’। এই সম্মিলিত অংশটুকুই হবে জনসার্বভৌমত্বের সত্যিকারের প্রতিফলন। অর্থাৎ ভোটাররা একই সঙ্গে দলগুলোর প্রতিনিধিকে ভোট দিয়ে সংসদে প্রেরণ করেছে এবং হ্যাঁ ভোটের মাধ্যমে তাদের দেওয়া নোট অব ডিসেন্টসহ সব অবস্থানের প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করেছে। বিএনপি সরকার কেবল এই সর্বজনস্বীকৃত ধারাগুলোই বাস্তবায়ন করবে এবং সব দল এবং জোটের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ সংবলিত বিষয়গুলো সংসদে বিতর্কের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করতে পারে। গণতান্ত্রিক উত্তরণকে স্থায়ী করতে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষকেই দায়িত্বশীল হতে হয়। উভয় পক্ষ নিজ অবস্থানে অনড় থাকলে সমাধান হতে হবে ‘কোয়ারসিভ’ বা বলপ্রয়োগমূলক, যা গণতন্ত্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন ‘প্যাসিফিক মেজারস’ বা শান্তিপূর্ণ উপায়। দুপক্ষকেই ছাড় দিয়ে সম্ভাব্য সংঘাত এড়িয়ে এই ‘কমন গ্রাউন্ড’-এ আসতে পারে।

সার্বিক দিক বিবেচনায়, এখন পর্যন্ত বড় মাপের কোনো অভিযোগ-অনুযোগ কিংবা তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাচন মোটাদাগে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে বলেই অনুমেয়। এ ক্ষেত্রে ভোটারদের অংশগ্রহণের যে চিত্র পাওয়া গেছে, তাই হবে এর পেছনে যৌক্তিকতা। তবে নতুন করে ধর্মের যাচ্ছেতাই ব্যবহার, বিরোধীমতের যে কাউকে অপদস্থ ও চরিত্রহনন করা, মিডিয়ার বদৌলতে যে অসহনশীল অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও আস্থাহীনতা বৃদ্ধি পেতে পারে ভবিষ্যতে। এগুলো রোধ করতে না পারলে, নতুন সরকারের শান্তি বিনির্মাণের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে। এই জন্য সামাজিক চুক্তির ন্যায় আমাদের রাজনৈতিক চুক্তি হওয়া দরকার, যা মূলত হবে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’-এর আলোকে। দলীয় নেতা-কর্মীরা সেখানে আগামী দিনগুলোতে ভেঞ্জেন্সফুল বা বিষোদগার এবং চরিত্রহননের রাজনীতি না করে নিজস্ব রাজনীতি হাজির করবেন। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার লড়াই হওয়া উচিত নয়, বরং এটি জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার একটি সমন্বিত প্রতিফলন হওয়া উচিত। কেবল সুস্থ রাজনৈতিক সহাবস্থান এবং অর্থবহ প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই এই ঐতিহাসিক রূপান্তর সফল হতে পারে। যদিও বিএনপি বারবার স্পষ্ট করার চেষ্টা করছে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে যে তারা ৩১ দফার মাধ্যমে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন করবে। জামায়াতের সেই আগ্রহটা আরেকটু বাড়ালে হয়তো পরবর্তী সময়ে নির্বাচিত সরকার এই রাজনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়ন করতে পারবে, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি হবে এবং নিজস্ব রাজনীতি উপস্থাপনের চেষ্টা থাকবে।

In conclusion, while good governance may dismantle the physical infrastructure of extortion, it remains powerless against the duplicity of religious core values that disguise predatory greed beneath a veneer of devotion. Whoever emerges victorious on February 12 will inherit a profound burden of public distrust. The BNP must do more than suspend minor cadres to shed the ‘extortionist’ label; it must uproot the entrenched culture of political plunder. Jamaat, conversely, must decide whether it is a 21st-century political party or a 7th-century ideological vanguard. Until then, Bangladeshi voters remain spectators to a familiar tragedy: the faces change, but the malignity persists over responsible politics.

প্রয়োজন সত্যিকার অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন। এর মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা স্থিতিশীল ও টেকসই হয়ে উঠবে। তখন কোনো দল দ্বিদলীয় ধারার অন্যতম প্রধান পক্ষ হয়ে উঠতে চাইলে নীতি ও কর্মসূচির মাধ্যমে ভোটারদের আকর্ষণ করার দীর্ঘ পথ বেছে নিতে হবে। অনিশ্চিত দীর্ঘ সময় কোনো দলকে নির্বাচনী মাঠের বাইরে রেখে নিজে প্রধান হয়ে ওঠা যে অসম্ভব– বিএনপি ও জামায়াত নিজেই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত এবং গ্রহণযোগ্য পন্থা হতে পারে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’, তা যে কোনো সময়ই কার্যকর করা হোক না কেন।

‘সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন’– এ ধরনের হতাশাজনক বাক্য আজকাল বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। অনেকের মতে, এর মূলে রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান ‘ঘৃণার চাষ’। ঘৃণা হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে আসে না। ঘৃণার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্কের যৌক্তিকতা অনস্বীকার্য। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে যখন অনিয়ন্ত্রিত ঘৃণার চাষ চলে, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোও ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ইতিহাসে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার সঙ্গে ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা এ ঘৃণা প্রকল্পের অংশ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থাও এতে ধরা পড়ে।