Newspaper & Media

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বললেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে শুধু গ্রেপ্তার অভিযান চালিয়ে স্থায়ী ফল পাওয়া সম্ভব নয়। গ্রেপ্তার মূলত একটি সাময়িক বা কিউরেটিভ মেজার ব্যবস্থা। অথচ মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন প্রিভেন্টিভ মেজার বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। অর্থাৎ মাদকের মূল উৎস, সীমান্তবর্তী চ্যানেল ও পুরো সাপ্লাই চেইন বন্ধ করা। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছা প্রয়োজন। কারণ মাদকের পেছনে বড় ধরনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত।’ স্বার্থের বলয় ভাঙতে সরকার কতটা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত, সেটিই মূল বিষয় বলে মনে করেন অধ্যাপক সাজ্জাদ। ‘মাদকের মূল সোর্স বা উৎসের জায়গায় হাত না দিয়ে শুধু শহরকেন্দ্রিক গ্রেপ্তারের সংখ্যা বাড়ানো হলে তা অনেকটা জনতুষ্টির চেষ্টা হয়ে দাঁড়ায়। এতে অপরাধ দমনের প্রকৃত চিত্র প্রতিফলিত হয় না।’

সব মিলিয়ে ‘রইদ’ কেবল সহজভাবে দেখার মতো কোনো সাধারণ চলচ্চিত্র নয়। আমাদের প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সর্বোপরি ‘সভ্যতা’ নিয়ে আমাদের যে তীব্র অহংকার, তার বিপরীতে এক বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দেওয়াই ছিল এই সিনেমার সবচেয়ে বড় সার্থকতা ও শক্তি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলছিলেন, মাদকাসক্ত মানুষের মধ্যে নীতি-নৈতিকতা বা ধর্ম-সমাজের কোনো ভয় থাকে না। তারা এমন একটি মানসিক অবস্থায় চলে যায় যে, নানা অপরাধসহ জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে দ্বিধা করে না। মাদকের রুট বা উৎস নিয়ন্ত্রণ এবং যারা মাদকাসক্ত হয়ে গেছে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা গেলে সমাজে ছিনতাই-রাহাজানিসহ নানা অপরাধ কমে আসবে। তার কথা, ‘এখানে মূল সমস্যা হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা বা প্রিভেন্টিভ মেজারের অভাব। মাদকের অর্থনীতি অত্যন্ত শক্তিশালী। যেমন বিদ্যুৎ খাতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট থাকে, তেমনি মাদকের ক্ষেত্রেও দেশি-বিদেশি এবং স্থানীয় চক্রের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এই চক্রের প্রভাব এতটাই যে, তা নীতিনির্ধারকদের স্তর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। যখন এই মূল উৎসে হাত দেওয়া সম্ভব হয় না, তখন অপরাধের প্রকৃত সংখ্যা আড়ালে থেকে যায়।’

সব দিক বিবেচনায় ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে কৌশলগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখাই দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ভাবমূর্তির জন্য মঙ্গলজনক। এই যুদ্ধ শুরুর দিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন করেছিল, আগামী দিনে তার পুনরাবৃত্তি না করাই হবে বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। এ ধরনের জটিল আঞ্চলিক সমীকরণে কোনো এক পক্ষকে পরোক্ষ সমর্থন দেওয়ার চেয়ে নীতিগত ভারসাম্য ও কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখাই হবে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার আসল বহিঃপ্রকাশ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী আগামীর সময়কে বলছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে পদ দখল এবং অর্থের সংস্থান যেখান থেকে হয়, সেই জায়গাগুলায় তাদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয়। আবার অনেক সময় দেখা যায়, পারিবারিক বা ব্যক্তিগত আক্রোশের জেরের অপরাধগুলো দলীয় ব্যানারে ঘটিয়ে প্রতিশোধ নিতে চায়। সবমিলিয়ে আধিপত্য ও প্রভাব বিস্তারে অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে। বিচারহীনতা অপরাধের প্রবণতাকে বাড়িয়ে দেয় উল্লেখ করে এই অপরাধ বিশ্লেষক বললেন, ‘যখন দেখা যায় অপরাধীকে বিচারের সম্মুখীন হতে হচ্ছে না, তখন অপরাধপ্রবণতা জোরালোভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি অন্যান্য সম্ভাব্য অপরাধীদের উৎসাহিত করে। সেই জায়গা থেকে দেশের স্বার্থে ও জনগণের স্বার্থে সরকারের এসব সহিংসতা কঠোর হাতে দমন করা উচিত।’ দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দলীয় পরিচয় না দেখে নির্মোহ দৃষ্টিকোণ থেকে অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি বলে মত অধ্যাপক সাজ্জাদ হোসেনের। তিনি বললেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা হলো— স্থিতিশীলতা যদি না থাকে, সেখানে লোকাল বা ফরেন ইনভেস্টমেন্ট (স্থানীয় বা বিদেশি বিনিয়োগ) আসবে না।’

‘শুধু কঠোর আইন করলেই যৌন নিপীড়নের মতো অপরাধ কমে না। যেসব দেশে আইনের কার্যকর শাসন ও ধারাবাহিক প্রয়োগ হয়, সেখানে এ ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা দুর্বল, আইনের ধারাবাহিক ও কঠোর প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানে আইনে মৃত্যুদণ্ডের মতো কঠোর শাস্তি থাকলেও বাস্তবে তার খুব একটা প্রভাব পড়ে না।’

According to Prof Sazzad Siddiqui, acting chairman at Dhaka University’s Peace and Conflict Studies, strong laws alone don’t reduce sexual crime. “Countries with effective rule of law and consistent enforcement keep such crimes under control, while even severe punishments like death sentences have little impact in places like Bangladesh where justice is weak and inconsistent,” he said.

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব জাস্টিস বা সহিংসতার বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। নির্বাচিত সরকার আসার পর আইন-শৃঙ্খলার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তারা এখন আর ভঙ্গুর অবস্থায় নেই, মনোবল ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে। এই সময়টাতে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের ঘটনা কমেছে।” তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক সময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী খুন এবং অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণে নিতে যে সহিংসতা চলছে, তা সরকারকে ভাবাচ্ছে। নিশ্চয় এসব নির্মূলে তাদের পরিকল্পনা রয়েছে এবং তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তা রাষ্ট্রের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়।” রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসায়ী ও পরিবহন খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—সরকার পরিবর্তন হলেও “চাঁদাবাজির ধরন বদলেছে, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।”

যেকোনো অপরাধের মূলে ব্যক্তিগত স্খলন দায়ী। অপরাধপ্রবণতা এবং স্বার্থপরতা মানুষের একধরনের সহজাত প্রবৃত্তি বা ‘বেসিক ইন্সটিঙ্কট’। সেই অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং সিস্টেম তথা কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে। আর সে কাজটা বাস্তবায়ন করতে হয় যথাযথ আইনের মাধ্যমে। তবে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা শিক্ষালয়ের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা চোখে পড়ার মতো। একজন শিক্ষক বা ইমাম যখন জানবেন যে তাঁর প্রতিটি কাজ একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামোর অধীনে রয়েছে, তখন তিনি এই ধরনের জঘন্য অপরাধে জড়িত হওয়ার আগে কয়েকবার ভাববেন। কিন্তু প্রায় সব মহিলা মাদ্রাসাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং পুরুষ নিয়ন্ত্রিত। কার্যত কোনো পরিচালনা পর্ষদ নেই। অনেক ক্ষেত্রে, এই ‘একনায়কতান্ত্রিক’ কাঠামো একজন ব্যক্তিকে অপরাধী হয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। ধর্মীয় পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও মানুষের আদিম প্রবৃত্তি বা অপরাধপ্রবণতা জাগ্রত হতে পারে, যদি সেখানে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ না থাকে। সুতরাং এটি নিছক ব্যক্তির দোষ নয়, বরং সিস্টেমের ব্যর্থতা। আমাদের সমাজে এখনো যৌন সহিংসতার শিকার নারীকে দোষারোপ করার প্রবণতা তীব্র। কখনো কখনো কেউ কেউ এই বিষয়টিকে ব্যক্তিগত, গোষ্ঠীগত ও রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। যদিও এমন ঘটনার সংখ্যা খুব বেশি নয়, তবে এর নেতিবাচক প্রভাব আসল ভিকটিমদের নিরুৎসাহিত করার পেছনে বড় ভূমিকা রাখে। এ ধরনের ঘটনা সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণে বাধা। আমি মনে করি, মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক অভিযোগের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। ফলে তা সত্যিকারের ভিকটিমকে সাহস জোগাবে অভিযোগ প্রকাশ করতে এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে।