Abstract:
This article explores the vital role of the Dhaka University Journalists' Association (DUJA) in Bangladesh’s democratic struggles while highlighting the urgent need for "Peace Journalism" in campus reporting. Student journalists often publish unverified allegations, causing severe personal, institutional, and societal harm. Citing the case of a falsely accused professor, the author demonstrates how irresponsible reporting and administrative bias weaponize allegations to fuel political rivalry. Peace Journalism prioritizes rigorous fact-checking, investigating root causes, ensuring accountability, and protecting individual dignity. Ultimately, adopting this approach can transform DUJA into a model for ethical, objective, and peace-oriented campus journalism nationwide.
..........................
এই প্রবন্ধটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি’র (ডুজা) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরে এবং ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় ‘পিস জার্নালিজম’ বা শান্তি সাংবাদিকতার জরুরি প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে। দেখা যায়, শিক্ষার্থী সাংবাদিকরা প্রায়ই সত্যতা যাচাই না করেই বিভিন্ন অভিযোগ প্রকাশ করে দেন, যা ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সমাজে মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা অভিযোগের উদাহরণ দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে দায়িত্বজ্ঞানহীন সাংবাদিকতা এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বকে রাজনৈতিক কোন্দলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। শান্তি সাংবাদিকতা মূল তথ্য যাচাই, ঘটনার গভীরে গিয়ে মূল কারণ অনুসন্ধান, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং মানুষের আত্মমর্যাদা রক্ষাকে অগ্রাধিকার দেয়। চূড়ান্তভাবে, এই নীতি অনুসরণ করার মাধ্যমে ‘ডুজা’ পুরো দেশের ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় একটি বস্তুনিষ্ঠ, নৈতিক ও শান্তিকামী মডেল হয়ে উঠতে পারে।
মূল লেখা: বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম, বিকাশ এবং গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাসহ প্রতিটি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কোনো-না-কোনোভাবে যুক্ত। উদাহরণ হিসেবে, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সমসাময়িক গণজাগরণের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে এই বিশ্ববিদ্যালয় জাতির বিবেক হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। বরাবরের ন্যায়, ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানেও এই বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু (এপিসেন্টার) হিসেবেই আবির্ভূত হয়। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাষ্ট্র যখনই কোনো রাজনৈতিক সংকট, গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপদতা কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসনের মুখোমুখি হয়েছে, তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবাদের ভাষা, যুক্তির শক্তি এবং নৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে পথ দেখিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (ডুজা) একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এই সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সময়। সে সময়টায় দেশ সামরিক শাসনের অধীনে ছিল এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ছাত্রসংগঠন আন্দোলন গড়ে তুলছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সেই আন্দোলনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। ক্যাম্পাসজুড়ে চলমান রাজনৈতিক কর্মসূচি, ছাত্র-জনতার প্রতিবাদ, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামের খবর সারা দেশে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত তরুণ সাংবাদিকদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডুজার সদস্যদের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার শুধু তথ্য সরবরাহের কাজে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং গণতন্ত্রকামী জনগণের কাছে তা হয়ে উঠেছিল আন্দোলনের গতি প্রকৃতি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। অনেক ক্ষেত্রেই এসব সংবাদ দেশব্যাপী আন্দোলনমুখী জনগণের জন্য জরুরি সেবার মতো কাজ করেছে এবং জাতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বলা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক সাংবাদিকতার একটি ঐতিহাসিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই ডুজা। এই যেমন, সর্বশেষ চব্বিশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থী-শিক্ষকের পাশাপাশি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ক্যাম্পাস সাংবাদিকও সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করতে দেখা গিয়েছে।
তবে, একটি বাস্তবতা অনস্বীকার্য। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় পর্যায়ে মর্যাদা অর্জন করলেও এই প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদনের মাধ্যমে সত্যিকারের প্রত্যাশিত “বিশ্ববিদ্যালয়” হয়ে উঠতে পারেনি। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পরও আমরা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক সহনশীলতা এবং জবাবদিহিমূলক শিক্ষার পরিবেশ ও সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। বিশ্ববিদ্যালয়ও এই বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার বাইরে নয়।
ডুজার সদস্যরা পেশাদার সাংবাদিক নন। তাঁরা মূলত বিশ্ববিদ্যালয়েরই নিয়মিত শিক্ষার্থী। সীমিত পারিশ্রমিক ও সীমিত প্রশিক্ষণ নিয়েই সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশন করার মতো কঠিন কাজটি করে থাকেন এই শিক্ষার্থী সাংবাদিকগণ। ফলে, এই সংগঠনকে একদিকে যেমন সাংবাদিকতার একটি প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র বলা যায়, অন্যদিকে এই প্রতিষ্ঠানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বের ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করা যায়। কেননা, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসরে যা ঘটে, তা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা অনেক সময়ই জাতীয় আলোচনার-সমালোচনার পাশাপাশি দিক নির্দেশনার অংশ হয়ে ওঠে।
আর এই কারণেই ‘পিস জার্নালিজম’ বা শান্তি সাংবাদিকতার গুরুত্ব সামনে এসেছে। নরওয়েজীয়ান শান্তি গবেষক ইউহান গালতুং এবং জ্যাক লিঞ্চ শান্তি সাংবাদিকতার ধারণাকে সম্প্রতি জনপ্রিয় করেন। তাঁদের মতে, সাংবাদিকতার কাজ শুধু সংঘাত, অভিযোগ বা উত্তেজনা প্রচার করা নয়; বরং সংঘাতের অন্তর্নিহিত কারণ, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য, মানবিক পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথ তুলে ধরা। এক্ষেত্রে ফলো-আপ সংবাদ প্রকাশও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। অন্যদিকে, ‘কনফ্লিক্ট জার্নালিজম’ প্রায়শই সংঘাতকে আরও তীব্র করে, পক্ষ-বিপক্ষের বিভাজন বাড়ায়। এমনকি নতুন করে মানুষের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশের জন্য এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কর্মরত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং গবেষক মিলিয়ে এখানে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের একটি বৃহৎ পরিবার গড়ে উঠেছে। কোনো অভিযোগ, গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্য যদি যথাযথ যাচাই ছাড়া সংবাদে রূপ পায়, তাহলে এর প্রভাব কেবল একজন ব্যক্তি ও তার পরিবারের ওপর নয়; বরং একটি বিভাগ, এমনকি পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের ওপর পড়ে।
আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রায়ই দেখা যায়, নির্বাচন-নির্ভর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রোশ, পেশাগত প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও অভ্যন্তরীণ বিরোধ কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতি, শারীরিক নির্যাতন ও যৌন হয়রানি, আর্থিক অনিয়মের মতো অনেক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়। সাংবাদিকতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থেই এসব অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হওয়া উচিত। কিন্তু সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা, যা পিস জার্নালিজমের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত।
অনেকক্ষেত্রে, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসনিক পেশাজীবীগণ নিজেদের ব্যক্তিগত অবস্থান, আদর্শিক বিরোধ কিংবা অতীতের কোনো ক্ষোভ থেকে সাংবাদিকদের কাছে (অপ) তথ্য সরবরাহ করেন। আবার কখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিরোধিতার কারণে এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে, যা প্রশ্নবিদ্ধ ও সুশাসন পরিপন্থি। একজন ক্যাম্পাস সাংবাদিকের কাজ কোনো পক্ষের মুখপাত্র হওয়া নয়; বরং প্রত্যেক পক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় এনে সত্য অনুসন্ধান করা।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, কখনো কখনো সাংবাদিকতায় কেবল ‘অভিযোগই’ প্রধান সংবাদ হয়ে দাঁড়ায়, যেই প্রবণতা কম-বেশি সারা বিশ্বেই পরিলক্ষিত। অনেক সময় অভিযোগকারী যা বলেন বা সরবরাহ করেন, তা-ই কোনো গভীর যাচাই-বাছাই ছাড়াই দ্রুত প্রকাশ করা হয়। এই ক্ষেত্রে, অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য, প্রমাণ, প্রাসঙ্গিক নথিপত্র কিংবা ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত গুরুত্ব পায় না। ফলে সেই সংবাদ অনিচ্ছাকৃতভাবেই একজন মানুষের মানহানি, মানসিক বিপর্যয়, পরিবারে ভাঙন এবং কর্মক্ষেত্রে তিনি চরম বৈরিতার শিকার হন। পরবর্তীতে, আইনি বা তদন্ত প্রক্রিয়ায় সেই অভিযোগ মিথ্যা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রমাণিত হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ফিরে পাওয়া সম্ভব হয় না। এমনকি, ভুল বা মিথ্যা প্রমাণের পর সেই সংবাদের সংশোধনী বা প্রয়োজনীয় ‘আপডেট’ প্রকাশের ক্ষেত্রে গণমাধ্যমগুলোতেও এক ধরনের অনীহা ও কার্পণ্য লক্ষ্য করা যায়।
এসব গুরুত্বপূর্ণ কারণেই পিস জার্নালিজম কেবল সাংবাদিকদের জন্য নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং প্রশাসনের জন্যও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদি কেউ তথ্য সরবরাহ করেন, তবে তাকেও তথ্যের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব নিতে হবে। অভিযোগকারীকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রশাসন যদি অন্যায় সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে হবে। আর সাংবাদিকের দায়িত্ব হবে, কোনো পক্ষের বয়ানকে সরাসরি সংবাদে রূপান্তর না করে তথ্য-যাচাই, নথি বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য গ্রহণের মাধ্যমে সাংবাদিকের ‘ইনটুইটিভ’ গুণাবলির সাহায্যে সত্য উদ্ঘাটন করা। এই একটিমাত্র নীতি অনুসরণের মাধ্যমেই সাংবাদিকতা পেশার অনন্য উচ্চতা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে ডুজা একটি অসাধারণ ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন কি না, ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত আন্তর্জাতিক মানের কি না, গবেষণার পরিবেশ কেমন, আবাসিক সংকট কতটা প্রকট ও এর সমাধানযোগ্য বিকল্প প্রস্তাব, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কতটা কার্যকর, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো কতটা স্বচ্ছ, যৌন হয়রানির মতো স্পর্শকাতর অভিযোগগুলোর আদ্যোপান্ত বিশ্লেষণ ও হালনাগাদকরণ ইত্যাদি। এসব প্রশ্নে তথ্যভিত্তিক ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও জবাবদিহিমূলক করে তুলবে নিশ্চিতভাবে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি আক্রমণ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুযোগ তৈরি হবে, নিশ্চিত করবে স্থায়ী সমাধান।
আমাদের মনে রাখতে হবে, দ্রুত সংবাদ পরিবেশন গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সঠিক সংবাদ পরিবেশন আরও গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকতার প্রথম নীতিই হওয়া উচিত, “সবার আগে নয়, সবার চেয়ে নির্ভুল।” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেহেতু দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয় অনেক সময়, তাই ডুজার পেশাদারিত্বও জাতীয় পর্যায়ে প্রভাব ফেলে। যদি ডুজা তথ্য-যাচাই, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মানবিক সংবেদনশীলতা, জবাবদিহিমূলক সংবাদ চর্চা, সর্বোপরি শান্তি সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে একটি মানদণ্ড স্থাপন করতে পারে, তবে দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক সংগঠনগুলোও এই মডেল অনুসরণ করবে। দীর্ঘ মেয়াদে পিস জার্নালিজমের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
তবে এই প্রত্যাশা পূরণ করতে হলে শুধু নৈতিক আহ্বান যথেষ্ট কার্যকরী হবে বলে মনে হয় না। এর জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষণ, গবেষণা, তথ্য-যাচাই দক্ষতা, পর্যাপ্ত কর্মপরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও ন্যায়সঙ্গত আর্থিক অনুদান। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রাক্তন সদস্যদের উচিত ডুজার সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় পিস জার্নালিজম, মিডিয়া এথিক্স, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং ডিজিটাল ফ্যাক্ট-চেকিং বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
সাংবাদিকতা যদি সমাজের দর্পণ হয়, তবে সেই দর্পণকে অবশ্যই স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত এবং মানবিক হতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি কেবল সংবাদ পরিবেশনের একটি সংগঠন নয়; এটি ভবিষ্যতের সাংবাদিক, শিক্ষক, গবেষক, নীতিনির্ধারক এবং বুদ্ধিজীবীদের একটি প্রাথমিক শিক্ষাক্ষেত্র। তাই এর সংবাদচর্চা যদি সত্য, মানবিকতা, জবাবদিহিতা এবং শান্তির মূল্যবোধ দ্বারা পরিচালিত হয়, তবে তা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য নয়, সমগ্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য একটি মূল্যবান অবদান হয়ে থাকবে।
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়ে লেখাটি শেষ করব। সময়টা ২০২১ সালের শেষের দিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ড. হাসানের (ছদ্মনাম) বিরুদ্ধে তাঁরই বিভাগের শিক্ষার্থী রামিসা (ছদ্মনাম) “শারীরিক হয়রানি”র একটি অভিযোগ তোলেন। অভিযোগে দাবি করা হয়, ১২ ডিসেম্বর বিকেলে গবেষণার বিষয়ে পরামর্শ গ্রহণ শেষে বিদায় নেওয়ার প্রাক্কালে, আনুমানিক ৪:১৫ মিনিটের দিকে, অভিযুক্ত শিক্ষক তাঁর অফিসকক্ষের একপাশ থেকে ওই শিক্ষার্থীকে টেনে-হিঁচড়ে জানালার পাশে নিয়ে যান এবং জোরপূর্বক তাঁর কপালে চুম্বন করেন।”
নিঃসন্দেহে এই ধরনের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর অপরাধের শামিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কতিপয় প্রতিবেদক ঘটনার গভীরতা কিংবা সত্যতা যাচাই না করেই, প্রথমে ‘শারীরিক হয়রানি’র বিষয়টিকে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পত্রিকায় ‘যৌন হয়রানি’ হিসেবে প্রকাশ করতে থাকে। পরবর্তীতে উচ্চতর প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, উক্ত শিক্ষার্থীর আনা অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও সাজানো ছিল।
তদন্ত শেষে কমিটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, “শিক্ষার্থী ‘রামিসা’ বিভাগীয় শিক্ষক ‘হাসানের’ বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উত্থাপন করেছে, কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা বা বিবৃতির মাধ্যমে তা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। মূলত, এই ঘটনাটি প্রমাণ করার মতো কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।” তবে, তদন্ত কমিটি সুনির্দিষ্ট কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ যুক্ত করে।
অভিযোগকারী শিক্ষার্থীর দাবি অনুযায়ী, কথিত ঘটনার পর তিনি মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং তাৎক্ষণিকভাবে মোহাম্মদপুরের নিজ বাসভবনে ফিরে যান। অভিযোগটি সত্য হলে এমন প্রতিক্রিয়া হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। অথচ আনুষ্ঠানিক তদন্তে দেখা যায়, কথিত ঘটনার দিন অন্ততপক্ষে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত অভিযোগকারী শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কনসার্টে উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া, অভিযোগকারী দাবি করেছিলেন তার সুপারভাইজারের সুপারিশের ভিত্তিতেই তিনি গবেষণার কাজে ড. হাসানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু তদন্ত কমিটির মুখোমুখি হয়ে উক্ত সুপারভাইজার এমন কোনো সুপারিশ করার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। এমনকি তদন্তে আরও একটি বিষয় প্রকাশ পায়, এই অভিযোগ সংক্রান্ত কোনো বিষয়েই অভিযোগকারী কখনো তার সুপারভাইজারকে অবহিত করেননি।
অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর এই সুস্পষ্ট মিথ্যাচার ও অসঙ্গতিগুলো বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত কমিটি তাকে আনুষ্ঠানিক সতর্কীকরণ নোটিশ প্রদানের সুপারিশ করে।
পরবর্তীতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩১/১০/২০২৩ তারিখের নিয়মিত সিন্ডিকেট সভায় এই সুপারিশটি চূড়ান্তভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
দীর্ঘ তদন্ত রিপোর্টে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। অভিযুক্ত শিক্ষকের বিভাগের তিনজন শিক্ষকের একটি চক্র আছে যারা উক্ত বিভাগের অন্যান্য ভিন্নমতের প্রায় সকল শিক্ষকের জন্যই ভীতির কারণ। তিনজনের একজন নারী শিক্ষিকা। তিন ভিন্ন সময়ে দুজন ছিলেন তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ফ্যাকাল্টি ভিত্তিক শিক্ষকদের সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক এবং একজন আহ্বায়ক।
তদন্ত রিপোর্টে যুক্ত হয়, ক্ষমতাসীন দলের শিক্ষকদের ফ্যাকাল্টি ভিত্তিক রাজনৈতিক অভ্যন্তরীণ কোন্দলের প্রেক্ষিতে এই অভিযোগ ছিল একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। অধিকন্তু, তদন্ত রিপোর্টে প্রমাণ হিসেবে যুক্ত হয় উক্ত নারী সহকর্মীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের একটি ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট তথা টেক্সট ডকুমেন্ট। অভিযোগ অনুযায়ী, কথিত ঘটনার দিন মধ্যরাতে এই নারী শিক্ষিকাকেই প্রথম বিষয়টি অবহিত করেছিলেন অভিযোগকারী। ফলে আইনি ও যৌক্তিক নিয়মে উক্ত শিক্ষিকার ভূমিকা ‘পরোক্ষ সাক্ষী’ বা ‘হিয়ারসে উইটনেস’ হওয়ার কথা ছিল। অথচ, “স্বার্থের সংঘাত” উপেক্ষা করে তিনি নিজেই বনে যান তদন্ত কমিটির একজন সদস্য। সামগ্রিক বিষয় পর্যালোচনা করে, তদন্ত কমিটি এই গভীর ষড়যন্ত্রের বিষয়টি আমলে নেয় এবং প্রতিবেদনে আরও একটি বিশেষ সুপারিশ যুক্ত করে:
“নারী শিক্ষার্থীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানির বিষয়টিকে বিভাগীয় অথবা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। এ বিষয়টি অভিযোগকারী ও অভিযুক্তসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহিত করা হোক। বিভাগীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির অস্ত্র হিসেবে শিক্ষার্থী লাঞ্ছনার ইস্যুটিকে ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ।”
কিন্তু সবচেয়ে উদ্বেগ ও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্তে অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সিন্ডিকেট ওই শিক্ষকের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির ওপর তিন বছরের নিষেধাজ্ঞা জারির এক অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেয়। উল্লেখ্য, অভিযুক্ত শিক্ষক ২০২৩ সালের ৫ অক্টোবর অধ্যাপক পদের জন্য আবেদন করেন। মাত্র ২০ দিনের মাথায়, ৩১ অক্টোবর ২০২৩ তারিখের সিন্ডিকেট সভায় তদন্ত কমিটির এই ‘শাস্তিমূলক সুপারিশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই চরম অন্যায়ের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী শিক্ষক উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলে চূড়ান্ত রায় তাঁর পক্ষে আসে এবং আইনগতভাবেই পরবর্তীতে তাঁর পদোন্নতি নিশ্চিত হয়।
এখানেই এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্নটি চলে আসে, যদি শুরু থেকেই এই ঘটনায় প্রকৃত ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা’র নীতি অনুসরণ করা হতো এবং গণমাধ্যমগুলো নিয়মিত বিরতিতে অভিযোগের আদ্যোপান্ত ও সত্যতা যাচাই করত, তবে একজন নিরপরাধ শিক্ষকের উপর অন্যায়ের মাত্রা এতটা তীব্র হতে পারত না। হয়তো ষড়যন্ত্রকারী চক্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই অবিচার করতে গিয়ে এতটা লাগামহীন হওয়ার সাহস পেত না। এমনকি, সংশ্লিষ্ট অনেকেরই জানা নেই ঘটনার আসল নেপথ্য কিংবা মূল অভিযোগটি কী ছিল এবং তা কতটা ভিত্তিহীন ছিল।
প্রকৃত সত্য অনুসন্ধান না করে কেবল ‘চাঞ্চল্যকর’ বা মুখরোচক সংবাদ পরিবেশন সমাজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মনস্তত্ত্বে এক গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এর সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, যখন ঢালাওভাবে মিথ্যা অভিযোগকে সত্য বলে প্রচার করা হয়, তখন সমাজে যারা সত্যি সত্যি নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার হন, তাদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথ সংকুচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
আজকের রূঢ় বাস্তবতায় যেখানে শিক্ষক সমিতি দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে ব্যস্ত এবং ছাত্রসংগঠনগুলো নিজস্ব গোষ্ঠীস্বার্থে বিভক্ত, সেখানে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি’ যদি ঘটনার গভীরে গিয়ে সত্য উন্মোচন করতে পারত, তবে তা ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে জাতীয় পর্যায়ে ‘পিস জার্নালিজম’ বা শান্তি সাংবাদিকতার এক অনন্য সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারত। গণমাধ্যমের এই শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ ভূমিকাই বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা, ন্যায্যতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারে। ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় এই প্রস্তাবিত নীতি মূলত সস্তা জনপ্রিয়তা কিংবা ক্ষমতার প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে তথ্য যাচাই, কঠোর বস্তুনিষ্ঠতা এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের মর্যাদা রক্ষা ও সম্ভাব্য ক্ষতি কমিয়ে আনার নীতিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিবে।
লেখক: অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
